বিনোদন সংস্কৃতি

পহেলা বৈশাখ : আগামীর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের এক অনুপম স্বপ্ন-পার্বণ !

সঞ্জীব কুমার বালা

চৈত্রের নিদাঘ দহনে দগ্ধ দিনান্তে, বছরের শেষ গোধূলীর আবছা আলো-আঁধারীতে বসে আছি, বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে। পশ্চিম আকাশে কাত হয়ে ঝুলছে শুক্লাপক্ষের অষ্টমীর চাঁদ। কিছুক্ষণ আগে ঝোড়ো হাওয়ার সাথে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, তাই ভেজা মাটির কেমন একটা মন উদাস করা হালকা গন্ধ চারদিকে। নানা রকমের পাখি ডাকাডাকি করতে করতে উড়ে এসে বসছে গাছের ডালে, ঝোপে
কতবছর থেকে যে এভাবে এসময়ে এখানে বসা হয় না, তা ঠিক মনে নেই। বাবাকে এভাবে বসতে দেখতাম। আসলে মধ্যবিত্ত জীবনের হাজারো টানাপোড়েন আর চাকুরী-সংসার সামলাতে গিয়ে এসব অনির্বচনীয় সৌন্দর্য্য দেখার সুকুমার মনটুকু হারিয়ে যায় আমাদের!
বসে ভাবছি, ঘনায়মান রাত কাল ভোর হবে বাঙলা ও বাঙালিয়ানার এক পরম উত্সব-উদ্ভাসের সোনালী সকাল নিয়ে। ১৪২৬ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখকে বরণ করতে রমনার বটমূল, টিএসসি, চারুকলা, শাহবাগ অ্যাভিনিউ হয়ে সব বিভাগীয়-জেলা-উপজেলা শহরে নামবে লাখো মানুষের ঢল। ইউনেস্কো ঘোষিত “ওয়ার্ল্ড ইনটেনজিবল হেরিটেজ” মঙ্গল শোভাযাত্রা থেকে ধ্বনিত হবে জাতির জাগ্রত বিবেকের বার্তা…
ভাবছি- এই জনপদের কোটি মানুষের স্বতন্ত্র জাতি-সত্তা নিয়ে আত্মপ্রকাশের শত শত বছরের সংগ্রামে অর্থাত্ৎ বাঙালির বাঙালি হয়ে ওঠায় ষড় ঋতু, বারো মাস আর তেরো পার্বণের বাংলা দিনপঞ্জী — “পহেলা বৈশাখ” কতটা নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে।
চিন্তা করছি, ষাটের দশকের শুরুতে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে আমাদের স্বাধীকার আন্দোলনের গতি যখন ক্রমেই বেগবান হচ্ছিল, তখন পয়লা বৈশাখ কী অমিত শক্তি নিয়ে রাজনৈতিক- সাংস্কৃতিক ধারায় যুক্ত হয়ে ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে অবধারিত করে তুলেছিল।
ভাবছি, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আশির দশকে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে নতুন আঙ্গিকে, নতুন চেতনা নিয়ে কিভাবে জেগে উঠেছিল পয়লা বৈশাখ!
আশা জাগে– সামাজিক অবক্ষয়, ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আরও বেগবান হয়ে জেগে উঠবে পয়লা বৈশাখ।অতীতে তো ব্যর্থ হয়নি কখনও।
গার্ডেন চেয়ারের পাশে থাকা স্মার্ট ফোনের রিং-টোন বেজে উঠতেই এমনসব ভাবনায় ছেদ পড়ল আমার।
—– হ্যালো! কেমন আছো? শুভ নববর্ষ-১৪২৬। কি কি প্রোগ্রাম কাল তোমার?
দীর্ঘদিনের বান্ধবী সুজাতা একনাগাড়ে কথা বলেই যাচ্ছে ওপাশ থেকে। বাস্তব জীবনেও যেন মান্না দে’র কফি হাউসের সেই সুজাতাই ও।” হীরে আর জহরতে আগাগোড়া মোড়া সে, গাড়ী বাড়ী সবকিছু দামী তার “। তবে এ সুজাতার স্বামী লাখপতি নয়, কোটিপতি।
—- এই তো আছি আরকি- ” দিন কেটে যায়, আশায় আশায়, আশায় আশায়…
তুমি কেমন? ভাবছি বসে বসে।
—- জাস্ট টেল মি হোয়াট আর ইয়্যু থিঙ্কিং এ্যাবাউট ?
—- ভাবছি ফ্যাশন হাউসের বাহারি শাড়ী-ড্রেস-কুর্তি-ফতুয়া-পাঞ্জাবী আর রঙিন মোড়কে মোড়া দামী খাবার-দাবার, দুর্মূল্য পান্তা-ইলিশ মিলিয়ে যে রঙিন জীবনের ঝলকানি দেখবো কাল, তাকে কী বলা যায়?
—- ইজ ইট আ ফ্যাশন-প্যারেড? তুমি তাহলে পয়লা বৈশাখকে কেমন আঙ্গিকে দেখতে চাও? দিগন্ত-বিস্তৃত ফসলের মাঠের প্রান্তে, বটের ছায়ায়, নদী-তীরের সেই চৈত্র সংক্রান্তি, বৈশাখী মেলা দেখতে চাও নাকি এখন? ইউ উইল নেভার গেট ইট ব্যাক, ডিয়ার! নেভার ফরগেট দ্যাট উই আর পাসিং টোয়েন্টি-ওয়ান হানড্রেড সেঞ্চুরি। ডন্ট বি সো নস্টালজিক।
সুজাতা বেশ কনফিডেন্টলি কথাগুলো বললো আমাকে।
—- ইয়েস আই নো ইট ভেরি ওয়েল। কিন্তু সেই বিবর্ণ অথচ আন্তরিকতায় ভরা আর সর্বজনীনতায় ঘেরা ভেঙে যাওয়া- বিধ্বস্ত সময়ের ঘ্রাণ আমি পাই, সুজাতা। ট্রান্সন্যাশনাল কর্পোরেট কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত টিভি-মিডিয়ার জমকালো প্রচারণায় পহেলা বৈশাখ এখন কম করে হলেও হাজার কোটি টাকার এক বিশাল বাজার। সমাজের উচ্চবিত্ত আর গ্রাম-শহরের পয়সাওয়ালা একশ্রেণীর মধ্যবিত্ত ছাড়া সে বাজারে কেউ প্রবেশ করতে পারে না।
তাই বিশাল ঐতিহ্যবাহী এ দিনটা তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য “সর্বজনীনতা”-কে হারিয়েছে। এ সবকিছুকেই বানানো, ম্যানুফাকচারড মনে হয় আমার।
—- হ্যাঁ, তোমার সাথে এ বিষয়ে আমি একমত। আর কি ভাবনায়?
—- ধর্মান্ধতা। ধর্মীয় উগ্রবাদ। এ অঞ্চলের দুটি দেশেই সাংস্কৃতিক- সাম্প্রদায়িকতার যে ভয়াবহ উত্থান ও বিস্তার প্রতিনিয়ত দেখছি, তাতে আমি শংকিত। এটা হিন্দুর সংস্কৃতি, ওটা মুসলিমের, ওটা ওয়েস্টার্ন কালচার… কত কথা! মনের গভীরে ধর্মান্ধতা লুকিয়ে রেখে পয়লা বৈশাখ বাহারি শাড়ী-কুর্তি-ফতুয়া-পাঞ্জাবী গা’য়ে চাপালে কী হবে?
—– রাজনৈতিক কথা আর নয় গো– লেট এ্যালোন পলিটিক্যাল টকস। অনেকদিন তোমার কন্ঠে কবিতা শুনি না। একটা কবিতা শোনাবে, প্লিজ।
—– এখন কি আবৃত্তির মুড আছে, সুজাতা? তবে মনের ক্যানভাসে ভেসে ওঠা নজরুলের “প্রলয় শিখা” কবিতার কয়েকটা লাইন শোন-

” কাটায়ে উঠেছি ধর্ম- আদিম নেশা
ধ্বংস করেছি ধর্ম-যাজকী পেশা
ভাঙি’ মন্দির ভাঙি’ মসজিদ
ভাঙিয়া গীর্জা গাহি সঙ্গীত,
এক মানবের একই রক্ত মেশা–
কে শুনিবে আর ভজনালয়ের হ্রেষা”
—- ধন্যবাদ তোমাকে। বিভাজিত নয়, পয়লা বৈশাখ আবার অমিত-প্রেরণা হয়ে চেতনার আকাশে ধ্রুব তারার মত জ্বলে উঠুক।
—- শুভ নববর্ষ !

(ছবি : কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ ডেপুটি হাই কমিশনার অফিসের উদ্যোগে পালিত হল শুভ নববর্ষ ১৪২৬। কলকাতা শহরের বিভিন্ন রাস্তা পরিক্রমা করে শোভাযাত্রা শেষ হয়। — ছবি সৌজন্য : ফারুক আহমেদ।)

NB

Leave a Reply